স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করল ইতালি, মেলোনি-সানচেজের মধ্যে উত্তেজনা
৯ দিন আগে মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তির আওতায় অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে ইতালি। আগামী এক মাস স্পেন থেকে ইতালিতে প্রবেশকারী ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশের নাগরিকদের জন্য বন্দর ও বিমানবন্দরে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও নথিপত্র যাচাই করা হবে ঘোষণা দিয়েছে মেলোনি সরকার।
সম্প্রতি মরক্কোর ভূখণ্ডে অবস্থিত স্পেনের ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) একদিনে প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসী প্রবেশের ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকে ইতালি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এঘটনায় ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতির প্রভাব থেকে ইতালিকে সুরক্ষিত রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে ইতালির এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে স্পেনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইতালির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, কোন দেশের এই পরিস্থিতিতে পাশের দাঁড়ানো বা সহমর্মিতা জানানো বাধ্যতামূলক নয় , কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির প্রতি সম্মান দেখানো বাধ্যতামূলক।
এসময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজ ফ্রন্টেক্সের তথ্য উল্লেখ করে দাবি করেছেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রবেশের ক্ষেত্রে ইতালিই ছিল ইউরোপের প্রধান প্রবেশপথ। এ সময়ে ইতালিতে প্রায় ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬০০ অনিয়মিত অভিবাসী প্রবেশ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এছাড়াও তিনি আরো দাবী করেন, অবৈধভাবে পাড়ি জমানো ৪৯ হাজার অধিবাসীর মধ্যে বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নিজ দেশে ফেরত চলে গিয়েছে। আর বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে পাঠানো হবে।
ইতালির সিদ্ধান্তে বিরোধিতা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ব্রাসেলস বলছে, সেউতায় অভিবাসীদের ব্যাপক প্রবেশের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক এবং এই পরিস্থিতি ‘অগ্রহণযোগ্য’। তবে সেউতা থেকে ইতালির দিকে কোনো অভিবাসী যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইইউর একজন মুখপাত্র বলেন, সেউতা ও মেলিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিরাগত সীমান্ত এবং সেখানে প্রয়োজনীয় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সেউতার পরিস্থিতি কীভাবে ইতালির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে, তা রোমকে ব্যাখ্যা করতে হবে।
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী এক মাস স্পেন থেকে ইতালিতে আসা তৃতীয় দেশের নাগরিকদের বৈধ কাগজপত্র পরীক্ষা করা হবে।
তবে ইতালির সরকার জানিয়েছে, স্পেন বা অন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করা হবে না। একইভাবে ইতালি থেকে স্পেনে যাওয়ার ক্ষেত্রেও কোনো পরিবর্তন থাকবে না।
তবে এবিষয়ে মেলোনি সরকার আরো জানিয়েছেন, প্রয়োজন শেষ হলে শেনজেন চুক্তি স্থগিতের এই ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হবে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পর্যটন ও যাতায়াতের ওপর যাতে নেতিবাচক প্রভাব কম পড়ে, সে বিষয়েও নজর রাখা হবে।
ইতালির সিদ্ধান্ত নিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পেনের সঙ্গে শেনজেন ব্যবস্থা স্থগিতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।
ইতালির সরকার জানিয়েছে, স্পেনের বহিরাগত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে ইউরোপীয় পর্যায়ে যেকোনো উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রোম।
ডেমোক্রেটিক পার্টির (PD) নেত্রী এলি শ্লেইন অভিযোগ করে বলেন, সরকার দেশের মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে অভিবাসন ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করছে।
ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তে সরকারের পদক্ষেপকে ‘সুযোগসন্ধানী রাজনীতি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, ২০২৩ সালে ল্যাম্পেদুসায় এক দিনে প্রায় ৬ হাজার অভিবাসী পৌঁছানোর সময় মেলোনি নিজেই ইউরোপীয় কমিশনের সহায়তা চেয়েছিলেন।
সেউতায় অভিবাসী প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতালি-স্পেনের মধ্যে তৈরি হওয়া এই বিরোধ এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রোমের আশঙ্কা, স্পেন থেকে অভিবাসীদের একটি অংশ ভবিষ্যতে সমুদ্রপথে ইতালির দিকে নতুন রুট ব্যবহার করতে পারে। সেই সম্ভাবনা ঠেকাতেই আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শেনজেনের অবাধ চলাচল সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে বলে ইতালীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।তবে সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে ইতালির বিরোধী দলগুলো।